প্রত্যাবর্তন এবং প্রতিবন্ধকতা !!

Posted: April 5, 2014 in ইসলাম, তাওহীদ
Tags:

হতে পারে আপনি এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি মোটেও ধার্মিক ছিলেন না। পরিবারের অন্যান্যদের ও বন্ধু-বান্ধবদের মতই আপনি আপনার জীবন কোনোরকম পার করে দিচ্ছিলেন।

কিন্তু হঠাৎ একদিন আপনার ভেতরে কিছু একটা অনুভূত হল এবং আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন , “ হ্যাঁ । আমি আমার ভেতরকার এই অনুভূতিকে গুরুত্ব দিব। আমি জানি না আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তা’আলা এটা কীভাবে ঢুকিয়েছেন আমার ভেতরে। হয়তোবা কোন বন্ধু ,ফেসবুকের নোট কিংবা ইউটিউবে দেখা কোনো ভিডিও দেখে  কিংবা যেভাবেই হোক এমন টা হয়েছে। কিন্তু আমি এই দিক নির্দেশনা সিরিয়াসলি নিচ্ছি , যা ই হোক না কেন। ! ” 

 

আপনি যখন ইসলামের পথে সঠিক ও পরিপূর্ণ ভাবে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করবেন তখন আপনার পরিবর্তন সবার আগে লক্ষ্য করবে আপনার পরিবার ও বন্ধু – বান্ধব । তার অল্প সময়ের মাঝেই দেখতে পারবে আপনি আর আগের মত নেই। আপনি আগের মানুষটি নেই।

আপনার কথা-বার্তা , চাল- চলন , আচরণে পরিবর্তন এসেছে এটা তারা সুস্পষ্ট ভাবে দেখতে পারবে। আপনার পরিবার দেখবে যে আপনার সাথে আপনার আগের বন্ধু-বান্ধবদেরও তেমন সম্পর্ক নেই। 

 

দুঃখজনক মনে হলেও এটা সত্যি যখন আপনি দ্বীনের পথে পা বাড়াবেন তখন আপনার পুরনো বন্ধুদের সাথে আপনার আকস্মিক একটা বড় ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হবে। কেননা আপনি আগে তাদের সাথে যেসব আপত্তিকর এবং তথাকথিত “fun-loving” কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন সেগুলো আপনার কাছে অসহ্য এবং অপ্রয়োজনীয় মনে হবে। কারণ আপনি সেসব কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত কিন্তু তারা নয়।

সুতরাং আপনি স্বাভাবিক ভাবেই আপনার কাছের বন্ধুদের হারাতে শুরু করবেন।।  

 

শুধু তাই না , আপনার পরিবার আপনাকে কটাক্ষ করতে শুরু করবে। আপনি অদ্ভুত আচরন করছেন দাবী করে আপনার দিকে আঙ্গুল তুলে বলবে , ” কি ব্যাপার তোমার মুখভর্তি দাড়ি কেন ?! শেভ করতে ভুলে গেছো নাকি !? সমস্যা টা কি তোমার ?!”

 

যখন মুসলিম বোনেরা হিজাব নেয়া শুরু করেন তখন তার পরিবার যেন আকাশ থেকে পরে।

 

আবারো মনে করিয়ে দিচ্ছি এখানে মুসলিম পরিবারের কথাই বলা হচ্ছে। 

 

তারা আপনাকে বলবে, ” এইসব মান্ধাতা আমলের , গোড়া পোশাক কেন গায়ে চাপিয়ে আছো তুমি!? এভাবে আমি তোমাকে বাইরে নিয়ে যেতে পারি না। তোমার কারণে আমাদের স্ট্যাটাস নিচে নেমে যাবে। বিব্রত হতে হবে। কে মারা গেলো হঠাৎ যে তোমাকে এমন হুজুরান হতে হলো ?! অযথাই কেন এমন ইসলামিক রোল মডেল হওয়ার ভুত মাথায় চাপলো ??”  

 

আপনার বন্ধুরা আপনাকে উপহাস করা শুরু করবে। শুরুতে বোঝানোর চেষ্টা করবে, ” কি রে ভাই ! তুই তো কিছুদিন আগেও আসর মাতাতি। মনে নাই? এখন কিছু হলেই হাদিস কপচানো শুরু করিস।” 

তাতেও কাজ না হলে বলবে , “ভাই ! চেনা আছে তোরে। এখন তুমি মসজিদে যাও । কিন্তু দুইদিন আগেও তোমার চেহারা কিন্তু আমরা দেখসি। যতই ভন্ডামী কর এতে আমাদের বোকা বানাতে পারবা না। লাইনে আসো ।”

কি ভয়ংকর ব্যাপার । লাইন আসা বলতে আসলে আপনাকে এরা কি বোঝাতে চাচ্ছে !?

 

প্রকারান্তরে , শুধু আপনার ফ্রেন্ড সার্কেলই নয় আপনার ফ্যামিলিও আপনাকে জঘন্য ভাবে উপহাস এবং বিদ্রুপের বিষয়ে পরিণত করবে।

 

সারাক্ষন। প্রতিটা মুহূর্ত । তারা ওঁত পেতে থাকবে আপনি কখন একটা বিন্দুমাত্র ভুল করবেন। সুযোগ পেলেই তারা আপনার হিজাব/ আপনার দাঁড়ি নিয়ে কিছু একটা বলবেই ।

 

আপনার সালাত আদায় করা নিয়ে তারা বলবে , তারা বলবে আপনার দাওয়া’ দেয়া নিয়ে , তারা বলবে আপনার ছোট ভাই- বোন কিংবা ছেলে মেয়েদের মাদ্রাসায় ভর্তি হতে উৎসাহ দেয়ার ব্যাপার নিয়ে। সবকিছু ছেড়েছুড়ে আপনার ফজর, ইশার সালাতে যাওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলবে তারা।

শুধু তাই না । সাথে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করতেও ছাড়বে না।

 

এবং সত্যিকার অর্থে এসব আপনাকে কষ্ট দিবে। আপনাকে অন্তরাত্মায় আগুন ধরিয়ে দিবে আপনার একসময়ের কাছের বন্ধু/ নিকটাত্মীয়দের নির্লজ্জ বাক্যবাণ ।

 

কম বয়সীদের ক্ষেত্রে বাবা-মা রা বলবেন কুসঙ্গ(!!) ত্যাগ করতে।  মসজিদে গিয়ে সময় নষ্ট করতে বারন করবেন !!

 

Wallahi( I swear to Allah) ! আমি নিজে দেখেছি এক ছেলে ক্লাস টাইমের ফাঁকের সময়টুকুতে মসজিদে যুহরের সালাত আদায়ের জন্য যেত। তার বাবা যখন টের পেয়ে যায় তখন তিনি বলে উঠেন,“তুমি তো মৌলবাদীদের মত আচরণ শুরু করেছো !! “

এবং মৌলবাদ কি !?! ছেলেটার বাবার কাছে মৌলবাদের সংজ্ঞা তার ছেলের ক্লাসের ফাঁকে মসজিদে যাওয়া !!!!! আশ্চর্য !

 

সুবহানাল্লাহ !! মুসলিমেরাই এসব করে চলেছেন।।

আর আপনি ভাবছেন অমুসলিমরা প্রতিকূলতা সৃষ্টি করে দ্বীনচর্চায় !!  

আপনি কি লক্ষ্য করেছেন মুসলিম পরিবার গুলো/মুসলিম পিতা-মাতা কি করছেন তাদের ছেলে-মেয়েদের সাথে !? 

 

আমি নিজে অনেক জায়গায় দেখেছি যেখানে ছেলেদের বলা হয় তাদেরকে পড়াশোনার খরচ দেয়া হবে না।

মেয়েদের বলা হয় তাদের জন্য পাত্র দেখা হবে না।

এবং এসব কথা কে বলছেন ?! আপনার মা।। আপনারই বাবা !! 

একজন মুসলিম মা তার মেয়েকে বলছেন, “যতক্ষণ না এই বোরখা, নেকাব না খুলছো তোমাকে মেয়ে বলে মেনে নিতেও আমার আপত্তি আছে। কে বিয়ে করবে তোমাকে ?! আমি তোমাকে নিয়ে পাবলিক প্লেসে যাচ্ছি না। ” 

সবচেয়ে বড় ব্যাপার তারা আপনাকে অপরাধবোধে ভোগাবে। তারা আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে যে সব দোষ আপনারই। আপনি তাদের বিব্রত করছেন। আপনি নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করবেন। যা নিতান্তই লজ্জাস্কর ব্যাপার।

তারা আরো বলবে, ” আমরা এসব করি না। এটা আমাদের কালচার না। এটা ঐসব হুজুর দের কাজ যারা কাজ-কাম ফেলে রেখে মসজিদে পরে থাকে। ঐসব তসবিগোনা লোকদের মত না আমরা। ” 

 

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে !? নাহ ! এটা বর্তমানের অতি সাধারন মুসলিম(!) পরিবারের চিত্র।

 

কিন্তু আপনি যদি আপনার দাদা / পরদাদা কিংবা দাদীর ছবি খুজে বের করে দেখেন দেখবেন আপনার দাদার দাঁড়ি গলা ছাড়িয়ে গেছে এবং আপনার দাদীর চেহারাই দেখা যাচ্ছে না নেকাবের কারনে। 

তাহলে কে পরিবারের সংস্কৃতি রক্ষা করে চলেছে ?! 

 

বর্তমানের মুসলিম পরিবারগুলোর চিত্র এখন এমনই। এবং আপনি এসবের মধ্যেই আটকে পড়েছেন। 

 

এখন কি করনীয় এমতাবস্থায় ?? যখনই কেউ আপনাকে নিরুৎসাহিত করতে চাইবে আপনি তাকে বলবেন , “ধন্যবাদ । আমি আমার ঈমান আরো মজবুত করব। আমি দ্বীনের রশি আরো শক্ত করে চেপে ধরব। ধন্যবাদ । মনে করিয়ে দেয়ার জন্য।” 

 

এধরনের বাঁধা-বিপত্তি যখন আসে তখন যে কাজটা একেবারেই করা উচিৎ না সেটা হচ্ছে ‘রেগে যাওয়া’ । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এটাই সবচাইতে কমন প্রতিক্রিয়া!

 

আপনার বাবা যখন আপনাকে বলে , ” দেখো বাবা! আমি তোমাকে ভালোবাসি দেখেই তোমার ভালো চাই। আর তোমার ভালো চাই বলেই বলছি দাঁড়ি এই বয়েসে মানায় না। আর একটু বড় হলে দাঁড়ি রাখো। সমস্যা নাই।”

আপনি কি করেন ?! রেগে যান । তার মুখের উপর চিৎকার করে বলে দেন , ” তুমি কালচার ফলো করো। আর আমি অনুসরণ করি সুন্নাহ। এসব বলে আমাকে বিভ্রান্ত করতে পারবা না।” বলে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে চলে যান।

 

আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তা’আলা কি এটা চান আপনার কাছ থেকে ?! তিনি কি চান আপনি আপনার বাবা-মা ‘র সাথে এধরনের আচরণ করেন ?? অবশ্যই না!!

 

হযরত ইব্রাহীম (আ) যখন উনার পিতাকে দাওয়াত দেন ইসলামের পথে তখন উনার পিতা উনাকে পাথর ছুড়ে হত্যা করার হুমকি দেন । মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ) কি উনার পিতার সাথে গলা উচু করেছিলেন ?!

 

সূরাহ মারইয়াম এর ৪৬-৪৭ নং আয়াতে উল্লেখিত –

 

পিতা বললঃ হে ইব্রাহীম, তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও, আমি অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণনাশ করব। তুমি চিরতরে আমার কাছ থেকে দূর হয়ে যাও। 

 

ইব্রাহীম বললেনঃ তোমার উপর শান্তি হোক, আমি আমার পালনকর্তার কাছে তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি মেহেরবান। 

 

 

সূরা আনকাবুতের ৮ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তা’আলা বলছেন ,

“আমি মানুষকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করার জোর প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আমারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বলে দেব যা কিছু তোমরা করতে।”   

 

শ্রদ্ধা করা এবং আনুগত্য প্রকাশ করা এক নয় । এটা অবশ্যই বুঝতে হবে । তাদের আনুগত্য প্রকাশ না করলেন কিন্তু শ্রদ্ধা করতে সমস্যা টা কোথায় ? আপনার পিতা-মাতা যদি আপনার দ্বীনচর্চার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়ও আপনার কোনোই অধিকার নেই তাদের সাথে রাগারাগি করার ।

 

ইসলামের সৌন্দর্যই তো এখানে নিহিত। সুবহানাল্লাহ !!!

 

আর বন্ধুবান্ধবদের দের ব্যাপারে সূরাহ ফুরকানের ২৮ নং আয়াতে সুন্দর করে বলা আছে ,

হায় আমার দূর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।

 

 

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে জ্ঞান দান করুন। আমাদের সবাইকে মাফ করুন। আমিন !

 

  • বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার Nouman Ali Khan এর একটি লেকচার থেকে  সংবর্ধিত ,পরিমার্জিত এবং সংযোজিত করে লেখা হয়েছে। 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s