In the shade of Laila’tul Qadr

Posted: September 8, 2014 in ইসলাম, কুর'আন এবং...

– ‘’ক্বাদর’’ এরঅর্থ ?

ইবনে হাজার আসকালানী (রহিমাহুল্লাহু) উনার বিখ্যাত ‘ফাতহুল বারী’ (৪/৩২৩-৩২৪) তে বলেন – “‘ক্বাদর’ শব্দটি যখন ক্বাদরের রাত্রির ক্ষেত্রে বিবেচিত হয় তখন এর বেশ কিছুব্যাখ্যা পাওয়া যায়।”

এটা বলা হয়ে থাকে ‘ক্বাদর’ বলতে মর্যাদা বোঝানো হয়।{“তারা আল্লাহকে যথাযথমর্যাদা’(ক্বাদর) দান করতে পারেনি”} {আল-আন’আম; ৯১}।তাই বলা যায়, এই রাত মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে নির্দেশিত হয়েছে যেহেতু – এই রাতে কুর’আন নাজিল হয়েছিল,এইরাতে ফেরেশতারা জমিনে নেমে আসেন, এই রাতে আল্লাহ সুবাহানওয়াতালার ক্ষমা ও করুনাবর্ষিত হয় কিংবা এই রাতে যারা সারা রাত জেগে থেকে ইবাদতে ব্যস্ত থাকেন তারা মর্যাদার অধিকারী।

এটাও বলা হয়ে থাকে যে এখানে ‘ক্বাদর’ অর্থ ‘সীমিত’ বোঝানো হয়েছে।{“আর যে ‘সীমিত’(ক্বাদর)পরিমানে রিজিকপ্রাপ্ত”} {আত-তালাক;৭}। এটা একারনে যে, এই রাতটি নির্দিষ্ট করা হয়নি বরং গোপন করা হয়েছে, অথবা একারনে যে অসংখ্য ফেরেশতার উপস্থিতিতে এই পৃথিবী সীমিত হয়ে যায়।

আরো বলা হয় যে,‘ক্বাদর’ শব্দটি ‘ফয়সালা/বিচার’ শব্দ থেকে উদ্ভুত। এটা একারনে নির্দেশিত যে ,এই রাতেই পুরো বছরের ফয়সালা করা হয়ে থাকে।

২ – হাজার মাসের চেয়েও উত্তম

ইবনে কাসীর(রহিমাহুল্লাহু) উনার ‘তাফসীর আল-কুর’আন আল-আজিম’(৪/৬৮৬) তে উল্লেখ করেন – মুজাহিদ(রহিমাহুল্লাহু) বলেন “বনী ইজরাইলের এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি সারা রাত ইবাদতে ব্যস্ত থাকতেন এবং সারাদিন জিহাদের ময়দানে যুদ্ধরত অবস্থায় থাকতেন এবং তিনি এক হাজার মাস এভাবে পার করেন। আল্লাহ সুবহানওয়া তা’আলা তারপর এই আয়াত নাজিল করেন {“ক্বাদরের রাত্রি হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম”}।তাই এই রাতে ইবাদতে মশগুল থাকা বনী ইজরাইলের ঐ ব্যক্তির কর্মের চাইতেও উত্তম।”

৩ – ২৭তম শব্দ

ইবনে কাসীর(রহিমাহুল্লাহু) বলেন(৪/৬৯০):

“…এবং কিছু সালাফ কুর’আন থেকে দলীল পেশ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে এই রাত্রি রমজানের ২৭তম রাত্রি যেহেতুهي’ (এ হচ্ছে) শব্দটি এই সুরার ২৭তম শব্দ। এবং অবশ্যই আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।”

৪ – যে কারণে নির্দিষ্ট রাতটি গোপনীয়

ইবনে হাজার(রহিমাহুল্লাহু) বলেন(৪/৩২৮):

“…এই গোপনীয়তায় কল্যাণ নিহিত থাকতে পারে।কারন যদি ক্বাদরের রাত্রি নির্দিষ্ট হয়ে যেত যেকোন একটি রাতে, তবে মানুষ শুধু ঐ রাতেই ইবাদতের জন্য বেছে নিত এবং অন্যান্য রাতে ইবাদতের মাধ্যমে কল্যাণ লাভ করা হতে বঞ্চিত হতো।এজন্যই যেন রাসুলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি আসসালাম) বলেছিনেন, “….হয়তোবা এতে তোমাদের কল্যাণ নিহিত

৫ – ভন্ডদের জন্য দুঃসহ বোঝার ন্যয়

ইবনে কাসীর(রহিমাহুল্লাহু) বলেন(৪/৬৯২) যে কা’ব আল-আহবার বলেন –

“যার হাতে আমার প্রান তার কসম, ক্বাদরের রাত্রি এত ভারী যে, তা অবিশ্বাসী এবং মুনাফিকদের পিঠে পাহাড়সম বোঝার ন্যয় ঠেকে।”

৬ – ক্বাদরের রাত্রিতে যে দু’আ করা উচিৎ

“সিলসিলা আস-সহীহাহ” (৩৩৩৭) তে উল্লেখিত, বর্ণিত আছে যে, আ’ঈশা(রাদিয়াল্লাহু আনহা)রাসুলুল্লাহ(صلىاللهعليهوسلم)কে প্রশ্ন করেন:“যদি আমি ক্বাদরের রাত্রি পাই তবে আমার কি দু’আ করা উচিৎ?”

তিনি উত্তর দিলেন; তুমিবলবে,

اللهمإنكعفوتحبالعفوفاعفعني

ও আল্লাহ ! তুমি ক্ষমা করো এবং ক্ষমা করতে ভালোবাসো। অতএব, আমাকে ক্ষমা করে দাও।

৭ – লাইলাতুল ক্বাদরের ছায়াতলে

সাইয়েদ কুতুব(রহিমাহুল্লাহু) ‘ফি জিলালিল কুর’আনে’(৬/৩৯৪৫-৬) এ বলেন –

আজ বহু যুগ অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমরা যখন সেই পবিত্র ও সৌভাগ্যময় রাতের দিকে তাকাই, তখন আমরা অবশ্যই সেই ঐশী দূতের মধুর পরশকে স্মরণ করি, কল্পনা করি অপরুপ সেই ওহীর আগমনজনিত আনন্দ-উৎসবের দৃশ্যটিকে, যা সে মধুর রাতে বিশ্ব অবলোকন করেছিলো, সেই বাস্তব সত্যের ব্যাপারে যদি আমরা ভাবি যা সে রাতে সংঘটিত হয়েছিল তাহলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয় এবং এতগুলো শতাব্দী পার হয়ে যাওয়ার পরও আমরা বারবার স্মরণ করছি ও পাতার পর পাতা লিখেচলেছি।পৃথিবীর এতো বিবর্তনের পরেও সে সেই আনন্দঘন মুহূর্তগুলোকে যত্নের সাথে হৃদয়ও অনুভূতির মনিকোঠায় ধরে রেখেছি। পৃথিবীর অসংখ্য ঘটনাবলীর মধ্য থেকে বের করে নেয়া সেই সুমধুর বার্তাগুলোকে আটকে রেখেছি।

আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখতে পাই সত্য,সঠিক এক মহাপ্রলয়ংকারী ঘটনাকে। দেখতে পাই এ রাতে আগত কুর’আনের ইংগিতবাহী নিগূঢ় সত্যটিকেও!তাই তো আল্লাহ’র পক্ষ থেকে, জিজ্ঞাসার সুরে বলা হচ্ছে-{তুমি কি জানো সেই ‘লাইলাতুল ক্বাদর’ টি কি?’}

এ রাতে প্রত্যেকটি বিজ্ঞানময় কাজ, যুক্তিভিত্তিক প্রত্যেকটি কথা ও জ্ঞানপূর্ণ বার্তা পৃথকপৃথকভাবে বিবৃত হয়েছে। সকল কিছুর যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দ্বার এ রাতেই উন্মোচিত হয়েছে। মানুষের প্রকৃত মূল্যায়নে এক নতুন অধ্যায়ের সুচনা হলো এবং অবিচার-অনাচারে ভরা বিশ্বে সুবিচার প্রতিষ্ঠার সুত্রপাত হলো।মানুষ তার বাঞ্ছিত মর্যাদা পেলো, সারাবিশ্বের ইতিহাসে যা কোনোদিন কোনো জাতির,কোনো গোত্রে কোনো মানুষ লাভ করেনি। সমাজের বুকে প্রত্যেকে তার যথাযথ স্থান পেলো অনবদ্য মানসিক শান্তি!

আজ মানুষের দুর্ভাগ্য, মূর্খতা ও হঠকারীতার কারণে এ পবিত্র রাতের সঠিক মূল্যায়ন করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

যেদিন থেকেই মানবজাতি আল্লাহ তা’আলার নিয়ামত সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পরেছে সেদিন থেকেই তারা এই সৌভাগ্যের সুফল পেতে ব্যর্থ হয়েছে।সৌভাগ্যের সুফল পেতে মানুষ আজ ব্যর্থ এবং প্রকৃত শান্তি লাভ করা থেকে আজ তারা বহু যোজন দূরে সরে গিয়েছে।সে আজ বিবেকের আত্মার শান্তি, ঘরের শান্তি এবং সমাজের শান্তি হারিয়ে ফেলেছে যা তাকে একমাত্র ইসলামই তাকে দিয়েছিল।এটা কখনোই বস্তুবাদী কিংবা পুজিবাদী সমাজব্যবস্থা, তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা অথবা ক্ষমতা ফিরিয়ে এনে দিতে পারবেনা। এ হচ্ছে মানবতার এক চরম দুর্ভোগ যে,সব রকমের বিলাসদ্রব্য লাভের পরও এবং সর্বপ্রকার জীবন ধারন সামগ্রী হাসিলের পরও নিজের প্রকৃতমালিক ও তার বানীকে ভুলে যাওয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।

সেই অসাধারন সুন্দর রাতে, সেই পবিত্র রজনীতে যে সৌভাগ্যপ্রদীপ তার সমুজ্জ্বল প্রভা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলো, সুন্দর ও মধুমাখা সেই নূরের ঝলক আজ নিভে গেছে, আজ আধুনিকতাগর্বী , হতভাগা ব্যক্তির হৃদয় থেকে সেই উজ্জ্বল খুশী হারিয়ে গেছে, যা একসময়ে তাকে ঊর্ধ্বাকাশের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলো, আজ তার অন্তরাত্মার আনন্দ ও শান্তিদূর হয়ে গেছে।আত্মার সঠিক জ্ঞানের সুষমাময় আলোর যে আশা ছিল তার পরিবর্তে আজ সে যা পাচ্ছে তা তার জীবনকে হতাশায় ভরে দিয়েছে।

আমরা যারা মু’মিন বা যারা আল্লাহ’র নির্দেশপ্রাপ্ত তারা যেন ভুলে না যাই অথবা উদাসীন না হয়ে যাই সে মহামূল্যবান উপদেশমালা আমাদের কাছে তার সুত্রপাত হয়েছিল এই মহান রাতে,যা আমাদের কে আমাদের প্রিয়নবী(সাল্লাল্লাহু আলাইহি আসসালাম) জীবন যাপনের সহজ সরল পথ হিসাবে দিয়ে গেছেন। যাতে করে আমাদের অন্তরের মণিকোঠায় আমরা চিরদিন তার শিক্ষাকে সঞ্চিত রাখতে পারি ,পরিবর্তিত পৃথিবীর যাবতীয় ঝড়ঝঞ্ছার কবল থেকে এ কিতাবের প্রতিআমাদের ভালোবাসা কে রক্ষা করতে পারি।

এজন্যই তিনি আমাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন এই রাতে ইবাদত করার এবং রমজানের শেষ দশ দিনে এই রাতকে অনুসন্ধান করি।২টি সহীহ হাদীসে উল্লেখিত, বর্ণিত আছে; “রমজানের শেষ দশ রাতে ক্বাদরের রাতকে অনুসন্ধানকরো!এবং ;“ঈমানের সাথে ও উত্তম প্রতিদানের আশায় যে ক্বাদরের রাতে ইবাদতে ব্যস্তথাকলো তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে!

ইসলাম শুধু কিছু বাহ্যিক কিছুআচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়। এজন্যই রাসুল(সা) উল্লেখ করেছেন ইবাদত করতে হবে ঈমানের সাথে ও উত্তম প্রতিদানের আশায়। এভাবে ঈমানের সাথে ইবাদতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ যেন এই রাতে সেই মহান অর্থ ও উদ্দেশ্য কে সামনেরেখে কি’আম করতে পারে যে উদ্দেশ্যে এই কুর’আন নাজিল করা হয়েছে।

প্রশিক্ষনের ইসলামী পদ্ধতি হচ্ছে অন্তরের মধ্যে ইবাদাত এবং তার তাৎপর্যকে পুনুরজ্জীবিত করে রাখা, এইসকল তাৎপর্যে স্পস্ট ও জীবন্ত রূপে ফুটিয়ে তোলার উপায় হিসেবে একে গ্রহন করা হয়েছে, যাতে মানুষের চেতনা উদ্বুদ্ধ হয় এবং এক পর্যায়ে গিয়ে যাতে সীমাবদ্ধ না হয়ে যায়। একথা প্রমানিত সত্য যে, ইবাদাতের তাৎপর্য হচ্ছে তাকে বাস্তব রূপ দেয়া। বিবেককে জাগিয়ে তোলা এবং জীবনকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করার জন্য এটাই একমাত্র সঠিক পদ্ধতি। মুখের কথার সাথে যদি কাজের মিল না থাকে তবে ইসলামে সে বিশ্বাসের কোনো মূল্য নেই। শুধু মুখের দাবী ব্যক্তিজীবন ও সামষ্টিক জীবনে কোনো পরিবর্তন বা পরিশুদ্ধি আনে না। ঈমানের এমন দাবী নিস্ফল ও নিরর্থক।

তাই লাইলাতুল ক্বাদরে আল্লাহ তা’আলা কে স্মরণকরা এবং ঈমানের সাথে, উত্তম প্রতিদানের আশায় ইবাদতে দাঁড়ানো ইসলামের কার্যকরীতার আরো একটি উল্লেখযোগ্য দিক।

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s